১৭ বছর পরও অমলিন পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন

১৭ বছর পরও অমলিন পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন

২০০৯ সালের ২৫ জুন, সব কিছু স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসন। আজ ২৫ জুন, ২০২৬। দেখতে দেখতে ১৭টি বছর পেরিয়ে গেল বিশ্বসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের প্রয়াণের। ২০০৯ সালের আজকের এই দিনে লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই পপ তারকা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। সে সময় এই মৃত্যুর খবর স্তব্ধ করে দিয়েছিল কোটি কোটি ভক্ত ও বিশ্বসংগীতের আঙিনাকে।

পপসম্রাটের এই ১৭তম প্রয়াণবার্ষিকীতে বিশ্বজুড়ে তার ভক্তদের উন্মাদনা এবার একটু বেশিই। কারণ, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হয়ে বড় পর্দায় এসেছে তার গৌরবময় ও একই সঙ্গে ট্র্যাজিক জীবনের গল্প। চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেয়েছে তার জীবননির্ভর বহুল আলোচিত বায়োপিক ‘মাইকেল’। এই সিনেমার মাধ্যমে রূপালি পর্দায় নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছেন এই কিংবদন্তি।


রেকর্ড ভাঙা বায়োপিক ‘মাইকেল’ ও নতুন চমক

চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যান্টোইন ফুকা পরিচালিত এবং লায়ন্সগেট ও ইউনিভার্সাল পিকচার্স প্রযোজিত ‘মাইকেল’ সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। প্রায় ১৫৫ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে ৯৬০ মিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার আয় করেছে। এর মাধ্যমে এটি ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে সফল ও সর্বোচ্চ আয়কারী মিউজিক্যাল বায়োপিক হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছে।

সিনেমাটিতে মাইকেল জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন মাইকেলের আপন ভাতিজা, তথা জেরমেইন জ্যাকসনের ছেলে জাফর জ্যাকসন। জাফর পর্দায় হুবহু তার চাচার লুক, কণ্ঠ ও আইকনিক নাচের মুদ্রা ফুটিয়ে তুলে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া মাইকেলের শৈশবের চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুলিয়ানো ভালডি। পপসম্রাটের বাবা জো জ্যাকসনের ভূমিকায় কোলম্যান ডমিঙ্গো এবং মা ক্যাথরিন জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিয়া লং।

সিনেমাটি নিয়ে দারুণ আলোচনার মাঝেই সম্প্রতি নতুন বিতর্ক ও আইনি জটিলতাও সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এসেছে। জাফর জ্যাকসনের বাবা জেরমেইন জ্যাকসনের বিরুদ্ধে ওঠা ১৯৮৮ সালের একটি পুরোনো যৌন নিপীড়নের মামলার রায় সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়ায় সিনেমার প্রচারণায় কিছুটা ধাক্কা লেগেছে। তবে এই বিতর্ক ছাপিয়েও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কৌতূহল ও উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর সিনেমাটির একটি সিক্যুয়েল বা দ্বিতীয় পার্ট নিয়েও ইতোমধ্যে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।

মাইকেলের ‘কিং অব পপ’ হয়ে ওঠা

১৯৬৪ সালে ভাইদের সঙ্গে ‘জ্যাকসন ৫’ ব্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন মাইকেল। শৈশব থেকেই তার ভেতর দেখা গিয়েছিল এক ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা। এরপর ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করেন একক পথচলা। বিশেষ করে আশির দশকে বিশ্বসংগীতকে একাই শাসন করেছিলেন তিনি। আর তাতেই তার নামের পাশে স্থায়ীভাবে জুড়ে যায় ‘কিং অব পপ’ বা পপসম্রাট উপাধি।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্ববাসীকে তিনি উপহার দিয়েছেন ‘বিট ইট’, ‘বিলি জিন’, ‘থ্রিলার’, ‘আই জাস্ট কান্ট স্টপ লাভিং ইউ’, ‘ব্যাড’, ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’, ‘ডার্টি ডায়ানা’, ‘দ্য ওয়ে ইউ মেক মি ফিল’, ‘ব্ল্যাক অর হোয়াইট’, ‘স্ক্রিম’, ‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘ইউ আর নট অ্যালোন’, ‘আই উইল বি দেয়ার’, ‘ডেঞ্জারাস’ কিংবা ‘লাভ নেভার ফেল্ট সো গুড’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী গান। গানের পাশাপাশি তার চোখধাঁধানো নৃত্যশৈলী, মঞ্চের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স আর সিগনেচার ‘মুনওয়াক’ নাচ তাকে যুগের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক চিরন্তন সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত করেছে। নতুন সিনেমাটিতে এই গান ও আইকনিক মিউজিক ভিডিওগুলোর পেছনের গল্পও নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

রহস্যে ঘেরা ব্যক্তিগত জীবন

সংগীতের ক্যারিয়ার যতটা জমকালো ছিল, মাইকেল জ্যাকসনের ব্যক্তিগত জীবন ততটাই ঘেরা ছিল রহস্য আর বিতর্কে। লিসা মেরি প্রিসলির সঙ্গে ১৯৯৪ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি, তবে সেই সংসার টেকে মাত্র দুই বছর। পরবর্তীতে ড্যাবি রো নামের এক নার্সকে বিয়ে করেন তিনি। এই সংসারে জন্ম নেয় ছেলে প্রিন্স ও কন্যা প্যারিস। এরপর এক সারোগেট মায়ের মাধ্যমে তার তৃতীয় সন্তান প্রিন্স মাইকেল দ্বিতীয় (ব্ল্যাঙ্কেট) পৃথিবীতে আসে। তবে সন্তানদের পিতৃত্ব নিয়ে সবসময়ই মুখরোচক সব গুঞ্জন তাড়া করে বেড়িয়েছে তাকে। বড় ছেলে প্রিন্সের সঙ্গে মাইকেলের চেহারার মিল না থাকায় অনেকেই দাবি করতেন, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ক্লেইন ও ড্যাবি রো-এর সন্তান এটি।


মাইকেলের রহস্যময় মৃত্যুর পর জল গড়ায় আদালত পর্যন্ত। কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক কনরাড মারেকে। আদালতের শুনানিতে জানা যায়, ঘুমের ওষুধ হিসেবে মাইকেলকে অতিরিক্ত মাত্রায় চেতনানাশক ‘প্রোপোফোল’ দিয়েছিলেন মারে, যা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০১১ সালে অবহেলার কারণে অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন মারে। অবশ্য মারে আদালতে নিজের দায় অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, মাইকেল নিজেই এই অতিরিক্ত ওষুধ নিয়েছিলেন। তবে আদালত মারের সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি।

কারাদণ্ড ভোগের পর কনরাড মারে এক বই লিখে মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন নিপীড়নের বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন। সেখানে মারে দাবি করেন, “মাইকেল জ্যাকসন ক্লাউনের (ভাঁড়) পোশাক পরতে ভালোবাসতেন। তিনি স্ট্রিপার ভাড়া করতেন এবং প্রায়শই তার হোটেলের রুমে কলগার্লদের ডেকে আনতেন।”


১৭ বছরেও অমলিন জাদু

জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধানে ১৭টি বছর কেটে গেলেও বিশ্বজুড়ে মাইকেল জ্যাকসনের আবেদন এতটুকু কমেনি। বরং নতুন বায়োপিক ‘মাইকেল’ মুক্তি পাওয়ায় এবং বক্স অফিসে ইতিহাস সৃষ্টি করায় পপসম্রাটের সোনালী দিনগুলো নিয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কৌতূহল ও উন্মাদনা এখন আকাশচুম্বী। সিনেমাটির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও উন্মোচিত হয়েছে বিশ্বসংগীতের এই অবিসংবাদিত অধ্যায়ের আদ্যোপান্ত। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই ট্র্যাজিক মৃত্যুর ১৭ বছর পর আজও মাইকেল জ্যাকসন তার সুর ও নাচের জাদুতে কোটি ভক্তের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।