ইউরোপ কি পারবে ট্রাম্পকে ঠেকাতে
গ্রিনল্যান্ড দখলে মার্কিন চেষ্টার প্রতিবাদে ডেনমার্কের রাজপথে গতকাল সাধারণ মানুষের ঢল। এ সময় তারা ‘গ্রিনল্যান্ড থেকে হাত সরাও’-এর মতো নানা ধরনের ট্রাম্পবিরোধী সেøাগান দেন। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন বার্তা লেখা প্ল্যাকার্ড। যেমনÑ ‘হ্যান্ডস অব গ্রিনল্যান্ড’, ‘গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীদেরই’, ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’ ইত্যাদি -দ্য গার্ডিয়ান
২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন বিশ্বজুড়ে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যখন ফের আর্কটিকের এই বিশাল দ্বীপটির ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ বাড়াচ্ছেন, তখন ডেনমার্ক তথা ইউরোপের কপালে চিন্তার ভাঁজ। প্রশ্ন উঠেছে, ভূরাজনীতির এই নতুন দাবার চালে ইউরোপ কি পারবে ট্রাম্পকে ঠেকাতে?
গ্রিনল্যান্ড কেবল বরফে ঢাকা ভূখণ্ড নয়; এটি বিরল মৃত্তিকা খনিজ ও ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার। চীনকে মোকাবিলায় আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে পেন্টাগন গ্রিনল্যান্ডকে অপরিহার্য মনে করে। ট্রাম্প প্রশাসন এবার আর সরাসরি ‘কেনার’ কথা বলছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি লিজ বা ‘বিশেষ প্রশাসনিক জোন’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে, যা কার্যত ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল ভেডবি রাসমুসেন এই পরিস্থিতিকে ডেনমার্কের জন্য অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “২০১৯ সালে আমরা একে রিয়েল এস্টেট ডিল ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে চাপ দিচ্ছেন। যদি আমেরিকা ন্যাটোর নিরাপত্তার শর্ত হিসেবে গ্রিনল্যান্ডকে ব্যবহার করতে চায়, তবে ডেনমার্কের পক্ষে ‘না’ বলা কঠিন হবে।”
সমস্যা হলো, গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার ডেনমার্ক থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা চায় এবং এর জন্য তাদের বিপুল অর্থের প্রয়োজন। আমেরিকা সেই সুযোগটাই নিচ্ছে। পোলার রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইনিশিয়েটিভের পরিচালক ড. ডোয়াইন রায়ান মেনেজেস মনে করেন, ইউরোপ এখানে দুর্বল অবস্থানে। তার মতে, ‘আমেরিকা সরাসরি গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকারের সঙ্গে বিশাল বিনিয়োগের চুক্তি করতে চাইছে। যদি গ্রিনল্যান্ডের মানুষ দেখে যে আমেরিকার সঙ্গে থাকলে তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাবে, তবে ডেনমার্ক বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবেগ দিয়ে তাদের আটকে রাখা যাবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই মুহূর্তে নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতেই ব্যস্ত। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো কনস্টানিয়ে স্টেলজেনমুলার সতর্ক করে দিয়েছেন, ইউরোপের হাতে ট্রাম্পকে ঠেকানোর মতো খুব বেশি কৌশল নেই। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ট্রাম্প যদি বাণিজ্য শুল্ক বাড়ান কিংবা ন্যাটোতে মার্কিন সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি হবে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে জার্মানি বা ফ্রান্স ডেনমার্কের জন্য আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়াবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।’ সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গ্রিনল্যান্ড সংকট এখন আর নিছক আঞ্চলিক বিষয় নয়। এটি আর্কটিকের সম্পদের ওপর দখল এবং আটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ইউরোপ যদি এখনই কোনো কার্যকর পাল্টা প্রস্তাব না দেয়, তবে গ্রিনল্যান্ড ধীরে ধীরে তাদের হাত ফসকে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
সূত্র ষদ্য গার্ডিয়ান ও সিএনএন
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমেরিকার মোহ
১৯৪৬ : তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুমান গ্রিনল্যান্ড কেনার জন্য ডেনমার্ককে ১০ কোটি ডলার (স্বর্ণ) দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ডেনমার্ক সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়।
১৯৫১ : কেনা সম্ভব না হলেও, একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডে ‘থুল’ বিমানঘাঁটি তৈরির অনুমতি পায়, যা স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০১৯ : ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে প্রথমবারের মতো গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন একে ‘অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দিলে ট্রাম্প তার ডেনমার্ক সফর বাতিল করেন।
২০২৫ : দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি ‘কেনা’র পরিবর্তে ‘দীর্ঘমেয়াদি লিজ’ বা ‘নিরাপত্তা জোন’ তৈরির প্রস্তাব দেন।
ট্রাম্পের দাবি, আর্কটিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব কমানোই তার মূল লক্ষ্য।
জানুয়ারি ২০২৬ : বর্তমান সংকট গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকারকে বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে আমেরিকা ডেনমার্কের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ইউরোপের সামনে এখন সার্বভৌমত্ব রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ।